নাইজেরিয়ান উপন্যাসিক চিনুয়া আচেবের ' থিংস ফল অ্যাপার্ট' পৃথিবী বিখ্যাত বই৷ আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপনের ফলে আবহমান সামাজিক নিয়মের সাথে ঔপনিবেশিক ইউরোপীয় খৃষ্টান সংস্কৃতি ও ধর্মের আদি পর্বের দ্বন্দ্ব উদ্ভবের আখ্যান আছে বইটিতে ৷ কেবল এতটুকু বললেই বইটি নিয়ে সবটা বলা হয় না৷ আফ্রিকা বহু বছর পশ্চিমাদের কাছে ছিল অজানা। ঔপনিবেশিক দখলদারিত্ব ও দাস ব্যবসার যৌক্তিকতা প্রমাণে ইউরোপীয়রা আফ্রিকার মানুষ ও সামাজিক ব্যবস্থাকে আদিম, অসভ্য ও বর্বর হিসেবে চিত্রিত করেছিল চিন্তা জগতে। আফ্রিকার সমাজব্যবস্থা ও গোত্রের ভেতরের লোকায়ত বিশ্বাস, সামাজিক ঐক্য, জীবনাচরণ ও উন্নত সামাজিক আদর্শের পরিচয় উপস্থাপন করতে চেয়েছেন উপন্যাসিক। নিচু সভ্যতা হিসেবে চিত্রিত আফ্রিকানদের জীবন উন্মোচনের প্রকল্প বলা যায় এটিকে। তবে ' কালো সভ্যতা মহান ' ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি লেখকের নেই। তিনি কেবল একটা ঐক্যবদ্ধ সমাজের সামাজিক রীতিনীতি ও জীবনচর্যা কীভাবে গড়ে ওঠে তার মূলে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। গোষ্ঠীবদ্ধ গ্রামগুলোর সব প্রথা নিশ্চয়ই ভালো নয়৷ যেমন: জমজ শিশুকে ছুঁড়ে ফেলে হত্যা করা, দেবতাদের নামে কাউকে শাস্তি দেওয়া ইত্যাদি। কিন্তু এসব নিয়মের কোনোটিতেই ব্যক্তিগত জিঘাংসার উল্লেখ নেই। বরং সামাজিক নিয়ম হিসেবে প্রতিপালিত। কেউ নিজ গোত্রের কাউকে ভুলবশত হত্যা করলে তাকে এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে হয়। কেউ তাকে বাঁধা প্রদান করে না। কিন্তু তার বাড়ি পুড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয় অপরাধের এক ধরনের শাস্তি হিসেবে। সাত বছর নির্বাসন শেষে হত্যাকারী শুদ্ধ হয়ে সমাজে ফিরতে পারে। তাদের সামাজিক সংস্কার ও সামাজিক আইনকানুন ছিল পারিবারিক ও সামাজিক উত্তরাধিকার হিসেবে। এই সমাজের জীবন বেছে নিয়ে চিনুয়া তার উপন্যাসে চিত্র এঁকেছেন কীভাবে ঔপনিবেশিক শক্তি প্রাচীন সমাজকে ভেঙে দিয়েছে। তার গল্পের নায়ক ওকোনকো৷ সে একজন বীর যোদ্ধা ও সামাজিকভাবে উপাধিপ্রাপ্ত ব্যক্তি । তৎকালীন সমাজে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সে কঠোর ও সাহসী পুরুষ। তবু কোথাও কোথাও তার মমত্ব ও সংবেদনশীল মনেরও পরিচয় পাওয়া যায়। উপন্যাসের দুই পর্বের প্রথম পর্বে উমুওফিয়ার সামাজিক জীবন ও নিয়মের সাথে জনজীবনের মিথস্ক্রিয়ার বিষয়গুলো জানতে পারা যায়। বোঝা যায় তাদের সংস্কৃতি কেমন ছিল। যেটি ভালো কিংবা মন্দ শব্দ দিয়ে চিহ্নিত করা যায় না অবশ্য। দ্বিতীয় পর্বে জানা যায় কীভাবে ইউরোপীয় সাদা মানুষেরা তাদের অঞ্চলে আসতে শুরু করে, নতুন ঈশ্বরের ধারনা, গির্জা ও বিচারালয় নিয়ে। পুরনো সমাজব্যবস্থা ও রীতিনীতির সাথে তাদের সমাজের দ্বন্দ্ব সংঘাত কীভাবে অনিবার্য হয়ে ওঠে সেই বিষয়টিই শেষ পর্বের উপজীব্য। চিনুয়া উপনিবেশকে কেবল ' Evil' হিসেবে দেখতে চাননি বলে মনে হয়েছে, বরং তিনি নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে গল্প বলে গেছেন। এর ফলে খন্ডিত হলেও বিশ্লেষণ করেছেন উপনিবেশিত মানুষ ও উপনিবেশ স্থাপনকারীদের মনস্তত্ত্বের স্বরূপ। নতুন সংস্কৃতির প্রভাবে পুরনো সংস্কৃতির ভাঙন অনিবার্য। তবে দেখতে হবে উপনিবেশ এশিয়া ও আফ্রিকার সমাজব্যবস্থাকে কীভাবে ধ্বংস করেছে৷ কিছু আলোও নিয়ে এসেছে অবশ্য। কিন্তু তাতে বলা যায় না ঔপনিবেশিক শাসন মোটেও ভালো কিছু। এই অনুবাদটি সংক্ষিপ্ত ও প্রাঞ্জল। বাংলা ভাষায় আরও অনুবাদ পাওয়া যায় । ইংরেজি সংস্করণটিও পড়ে দেখা দরকার। সংক্ষেপিত অনুবাদে মূলকথাটা পাওয়া গেলেও মূলের স্টাইলটা পাওয়া যায় না।