রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'চার অধ্যায়' বাংলা উপন্যাসের ধারায় যেমন একটি ব্যতিক্রমী সৃষ্টি, তেমনি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যধারায়ও এটি ভিন্নভাবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।সাহিত্য সমালোচক শ্রী শ্রীশচন্দ্র দাশ এটিকে সামাজিক উপন্যাস শ্রেণিভুক্ত করেছেন।এ ধরনের উপন্যাসে সমাজের রাষ্ট্রিক,অর্থনৈতিক বা ধর্মীয় বিষয়বস্তুর অবতারণা থাকে৷ সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের 'চার অধ্যায়' উপন্যাসের সমগোত্রীয় উপন্যাসগুলো - বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল;শরৎচন্দ্রের গৃহদাহ, পল্লী সমাজ, পথের দাবী, প্রফুল্ল সরকারের 'বিদ্যুৎ -লেখায়' প্রভৃতি। এই উপন্যাসটিকে যদি আরও নির্দিষ্ট করে রাজনৈতিক উপন্যাস বলা যায় সেক্ষেত্রে প্রথমেই শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী ' উপন্যাসের কথা মাথায় আসে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক উপন্যাস নয়, বরং রাজনীতি ও মানবিকতার দ্বন্দ্ব, প্রেম ও আদর্শের সংঘর্ষ, এবং নৈতিকতার সূক্ষ্ম সংকট এখানে প্রতিফলিত হয়েছে। শরৎচন্দ্রের 'পথের দাবী ' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৬ সালে,রবীন্দ্রনাথের 'চার অধ্যায়' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে। পথের দাবী বৃটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হলেও, চার অধ্যায় কিন্তু বাজেয়াপ্ত হয়নি।তবে যথেষ্ট বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল।

'চার অধ্যায়' উপন্যাসটিকে রবীন্দ্রনাথ নিজেই রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে মানতে চাননি। রবীন্দ্রনাথ “চার অধ্যায়” সম্পর্কে বলেন, “এই উপন্যাস রচনায় কোনো বিশেষ মত বা উপদেশ আছে কিনা সে-তর্ক সাহিত্যবিচারে অনাবশ্যক। স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে এর মূল অবলম্বন কোনো আধুনিক বাঙালি নায়ক-নায়িকার প্রেমের ইতিহাস।”

 এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করেন যে, উপন্যাসটি সাহিত্য হিসেবে বিচার্য এবং এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গৌণ।তবে আমরা এটিকে সামাজিক-রাজনৈতিক উপন্যাস হিসেবে বিবেচনা করব।চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত এই রচনায় বিপ্লবী রাজনীতি যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত করে মানুষের অন্তর্গত অন্ধকার, যেখানে আদর্শ ক্রমে হয়ে ওঠে ক্ষমতার হাতিয়ার।


গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ইন্দ্রনাথ—একজন দৃঢ়চেতা, আত্মবিশ্বাসী এবং সর্বজ্ঞতার আবরণে আবদ্ধ নেতা। লেখক তাঁকে সাধারণ মানুষের সীমা ছাপিয়ে এক ধরনের অতিমানবীয় অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ইউরোপে শিক্ষা ও পেশাগত প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেই নিশ্চিন্ত জীবনের প্রলোভন পরিত্যাগ করে স্বদেশের বিপ্লবী আন্দোলনের ডাকে সাড়া দিয়ে ফিরে আসেন।


ইন্দ্রনাথকে ঘিরে গড়ে ওঠে একদল তরুণের সমষ্টি-এলা, অতীন্দ্র প্রমুখ—যাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও মানসিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়েই কাহিনির বিস্তার ঘটে। বিপ্লবী আদর্শে অবিচল ইন্দ্রনাথ নিজেকে কেবল একজন চিন্তাবিদ হিসেবে নয়, বরং সক্রিয় নেতৃত্বদাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচালনায় তরুণেরা বিপ্লবের পথে অগ্রসর হয় এবং দলের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে তারা সহিংস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকেও বৈধ বলে মেনে নেয়।


এই আদর্শের নিষ্ঠুর পরিণতি প্রকাশ পায় তখনই, যখন দলের স্বার্থে ইন্দ্রনাথ অতীন্দ্রকে এলার জীবন শেষ করার নির্দেশ দেন। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে গল্পটি এক নির্মম ও অন্ধকার সমাপ্তির দিকে গড়িয়ে যায়, যেখানে বিপ্লবের নামে মানবিক সম্পর্ক ও নৈতিকতা সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।


উপন্যাসে অতীন্দ্র ও এলার সম্পর্ক কেবল প্রেমকাহিনি নয়, বরং বিপ্লবী রাজনীতির অন্তর্লোকের সংকটকে উন্মোচনের এক শক্তিশালী মাধ্যম। ব্যক্তিগত টান ও আদর্শিক কর্তব্যের সংঘর্ষে এই সম্পর্ক ক্রমে এক ট্র্যাজিক রূপ নেয়।


এলার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মাতা এবং নিষ্পাপ, বাস্তববিমুখ এক মনোবিজ্ঞানী পিতার ছায়ায়। সেই আশ্রয় ভেঙে পড়ে আত্মীয়স্বজনের স্বার্থপর পরিবেশে গিয়ে, অবশেষে দেশসেবার নামে সে নিজেকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত করে। এলার প্রতি আকর্ষণ থেকেই অতীন্দ্রও ইন্দ্রনাথের নেতৃত্বাধীন একই দলে যোগ দেয়। এলা ও অতীন্দ্র—যারা পরস্পরকে আদর করে এলী ও অন্তু বলে—পাঠকের সামনে বিপ্লবের আদর্শগত ক্ষয় ও মানবিক বিপর্যয়ের এক করুণ চিত্র তুলে ধরে।

অতীন্দ্র ধীরে ধীরে উপলব্ধি করে যে এই পথ আর ন্যায়সংগত নয়; হয়তো কোনো এক সময় তা অর্থবহ ছিল, কিন্তু এখন তা মানবিক মূল্যবোধকে গ্রাস করছে। তবু সে সরে দাঁড়াতে পারে না, কারণ এলাই তাকে দেশের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, এলা গভীর মানসিক টানাপোড়েনে ভেঙে পড়তে থাকে—বারবার অতীন্দ্রের কাছে ফিরে যেতে চাইলেও ইন্দ্রনাথের শাসন ও বিপ্লবের প্রয়োজন সেই পথ বন্ধ করে দেয়।


এই জটিল সম্পর্কের মাঝে বটু নামের এক পার্শ্বচরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। সে বাইরে থেকে বিপ্লবের সহযাত্রী হলেও আসলে পুলিশের গুপ্তচর। এলার প্রতি তার মোহ প্রবল, আর তার মুখে বিপ্লবী বুলি কেবল ফাঁপা কথার প্রদর্শনী। এলাকে কেন্দ্র করেই অতীন্দ্রের প্রতি তার বিদ্বেষ জন্ম নেয়। পরিস্থিতির শেষপ্রান্তে এসে বটু এলাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়—এই শর্তে যে, বিয়ে করলে সে পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাবে। এলার প্রত্যুত্তর ছিল নির্মম ও স্পষ্ট: একটি চিঠিতে সে শুধু এক শব্দ লিখে দেয়—“পিশাচ”।


এলার প্রতি অতীন্দ্রের নিঃশর্ত ভালোবাসা এবং ইন্দ্রনাথের কঠোর কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব উপন্যাসকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দেয়। প্রথম অধ্যায়ে ইন্দ্রনাথ ও এলার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে জানা যায়, এলার আবেগ ও দুর্বলতা ইন্দ্রনাথের অজানা নয়। দ্বিতীয় অধ্যায়ের কেন্দ্রে আসে এলা-অতীন্দ্রের প্রেমসংকট, যেখানে অতীন্দ্রের কণ্ঠে উচ্চারিত এক বিখ্যাত চার পঙ্‌ক্তির কবিতার স্মৃতি প্রেমের অনিবার্য সর্বনাশের ইঙ্গিত দেয়। তৃতীয় অধ্যায়ে ইন্দ্রনাথের আদেশে অতীন্দ্র আত্মগোপনে যায়; এলার উপস্থিতিতেই সে আবার এলাকেই প্রত্যাখ্যান করে। আর চতুর্থ অধ্যায়—এলা ও অন্তুর শেষ পর্ব—সবচেয়ে নির্মম। ক্লোরোফর্ম হাতে অতীন্দ্র আসে হত্যার আদেশ নিয়ে। জন্মদিনে পাওয়া এলার প্রথম চুম্বনের স্মৃতিই হয়ে ওঠে শেষ চুম্বনের অবসান; সেই চুম্বন সম্পূর্ণ করেই সে নিজের কর্তব্যকে শেষ করে দেয়।


রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসে প্রেমের সূক্ষ্ম অনুভব, বিপ্লবের নিষ্ঠুর বাস্তবতা এবং মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে গভীর শিল্পবোধে মেলাতে পেরেছেন। বুদ্ধদেব বসুর ভাষায়, "এলা ও অন্তুর প্রেমকাহিনিতেই চার অধ্যায় উপন্যাসের প্রকৃত মহিমা নিহিত—যে লিরিক তীব্রতা রবীন্দ্রনাথের বহু উপন্যাসেও এত গভীরভাবে ধরা পড়েনি৷" তবে আমার ব্যক্তিগতভাবে এই উপন্যাসকে দুর্বল বলে মনে হয়েছে। 


শরৎচন্দ্রের পথের দাবীর পাশাপাশি রাখলে 'চার অধ্যায়' কে কিছুটা ফিকে বলে মনে হয়। ইন্দ্রনাথ, সব্যসাচীর আদলেই গড়া বলে মনে হতে পারে। বিপ্লবী রাজনীতির যে আখ্যান শরৎচন্দ্রের পথের দাবীতে ফুটে উঠেছে, চার অধ্যায়ে সেটা অতটা প্রবল হতে পারেনি। 'চার অধ্যায়' এ রবীন্দ্রনাথ বৃটিশ সরকারকে যতটা না শত্রু হিসেবে দেখিয়েছেন, তার থেকে বেশি ফুটে উঠেছে বিপ্লবী রাজনীতির সংকট ও অন্তঃসারশূন্যতা। এলা ও অতীন্দ্রের প্রেমের দ্বন্দ্বকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে বিপ্লবী রাজনীতিকে রোমান্টিকতায় হারিয়ে ফেলেছেন।শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় চার অধ্যায়-কে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেন,“চার অধ্যায় রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে নির্দয় উপন্যাস—এখানে তিনি কোনো মোহ রাখেননি, বিপ্লবী রাজনীতির রোমান্টিক পর্দা ছিঁড়ে দিয়েছেন।”কিন্তু আমার ধারণা রবীন্দ্রনাথ রোমান্টিকতা থেকে বের হতে পারেননি।উপন্যাসটি স্বল্পদৈর্ঘ্য। এর মধ্যে নাটকীয় গুণের পরিচয় রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের নাটকে যেমন প্রতীকের ব্যবহার লক্ষ করা যায় তার প্রভাব উপন্যাসটিতে লক্ষ্যণীয়। কেউ কেউ ইন্দ্রনাথকে কেন্দ্রীয় চরিত্র মনে করলেও এখানে 'এলা' চরিত্রটিকেই প্রধান ও প্রভাবশালী হিসেবে বিবেচনা করতে চাই। উপন্যাসটি বৃটিশ সরকার ও বিপ্লবী রাজনীতি উভয় শিবিরেই সমালোচিত হয়েছিল। ভয় ছিল নিষিদ্ধ হওয়ার। অন্যদিকে বিপ্লবী রাজনীতির সংকটকে তিনি যেভাবে তুলে ধরেছিলেন তাতে বিপ্লবী গোষ্ঠীও চটেছিল।রবীন্দ্রনাথের নিজের মনেই সম্ভবত উপন্যাসটি নিয়ে দ্বিধা ছিল।উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ করার সময় রবীন্দ্রনাথ অমিয় চক্রবর্তীকে লেখেন, “এটা কেবলমাত্র চলনসইয়ের চেয়ে বেশি নয়, অথবা তার চেয়েও কম, তাহলে ছাপতে দিয়ো না।” আমার কাছে এটি রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস না হলেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার যোগ্য।

© ইয়াসির আরাফাত