প্রাচীন পৃথিবীর দর্শনের কথা ভাবলেই আমাদের মানসপটে ভেসে ওঠে সক্রেটিসের(৪৭০-৩৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) প্রতিকৃতি যিনি কোনো এক রৌদ্দোজ্বল পথে দাঁড়িয়ে তরুণদের সামনে বক্তৃতা করছেন কিংবা পন্ডিত অ্যারিস্টটলের(৩৮৪- ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) কথা মনে পড়ে যিনি লাইসিয়ামে অধ্যাপনা করছেন। কিন্তু আমরা কি অ্যাসপাশিয়ার কথা জানি, যিনি এথেন্সের একজন শীর্ষ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার বিদেশি উপপত্নী ছিলেন, যিনি রাজনৈতিক ও প্রেম-মূলক ব্যাপারে পরামর্শ দিতেন?অথবা সোশিপত্র, একজন অতিন্দ্রীয়বাদী, সন্তানের জননী এবং একজন নব্য-প্লেটোনিক, যিনি তাঁর স্বামী অ্যাসটেথিয়াসের থেকেও জনপ্রিয় শিক্ষয়ত্রী ছিলেন। আমাদের হাতে দর্শনের যে ইতিহাস এসে পৌঁছেছে তাতে শুধু পুরুষের জয়জয়কার। কিন্তু দর্শনের উন্নয়ন ও বিকাশে নারীরাও অবদান রেখেছেন। যদিও মোটের উপর তাঁদের কোনো লেখাপত্রই টিকে থাকতে পারেনি,তথাপি এতটুকু জানা যায়, তাদের মৌখিক শিক্ষাদান সমকালীনদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিল এবং তাদের কন্ঠস্বর যুগের পর যুগ ধরে অন্যদের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। দুই হাজার বছর পরে আজও নারীদের নিজ কন্ঠস্বর শোনানোর জন্য সংগ্রাম করতে হয়। নারীদের ইতিহাস থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে অথবা ইতিহাসের পাতা থেকে তাঁরা হারিয়ে গেছেন।প্রাচীন যুগের সামান্য কয়েকজন নারী দার্শনিক বা চিন্তকের কথা জানা যায়।প্রাচীন নারীদের সম্পর্কে এই আলোচনার মূল ভিত্তিভূমি পাশ্চাত্য লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিজাত হওয়ায় এতে ভারতীয় নারীদের কথা বাদ পড়েছে। এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে লেখাটিতে কয়েকজন নারী দার্শনিক বা চিন্তকের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা দেওয়ার প্রয়াস করা হয়েছে।
১.অ্যাসপাশিয়া অব মিলেটাস
অ্যাসপাশিয়া অব মিলেটাস (৪৭০-৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) প্রাচীন অ্যাথেন্সের একজন বিখ্যাত মহিলা ছিলেন।[ অথবা আমাদের কি বলা উচিত কুখ্যাত? কিছু ঐতিহাসিক বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন, অ্যাসপেশিয়া ছিলেন একজন রক্ষিতা এবং একটি পতিতালয় চালাতেন।] অ্যাসপাশিয়া ছিলেন একজন বিদেশিনী এবং পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধের শুরুর দিকে তিনি অ্যাথেন্সের রাজনৈতিক নেতা পেরিক্লিসের উপপত্নী ছিলেন।
তিনি তাঁর মনোহারিনী সৌন্দর্যের জন্য নয় বরং, চিত্তাকর্ষক অন্তঃকরণের জন্য স্মরণীয় হয়েছেন।সক্রেটিস নিজেই অ্যাসপাশিয়াকে তাঁর শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং সক্রেটিস তাঁর কাছে শিখেছেন কিভাবে প্ররোচনামূলক বক্তব্য তৈরি করতে হয়। তিনি লিখেছেন, অ্যাসপাশিয়া সেগুলো পেরিক্লিসের জন্য লিখতেন।
তিনি তাঁর মনোহারিনী সৌন্দর্যের জন্য নয় বরং, চিত্তাকর্ষক অন্তঃকরণের জন্য স্মরণীয় হয়েছেন।সক্রেটিস নিজেই অ্যাসপাশিয়াকে তাঁর শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং সক্রেটিস তাঁর কাছে শিখেছেন কিভাবে প্ররোচনামূলক বক্তব্য তৈরি করতে হয়। তিনি লিখেছেন, অ্যাসপাশিয়া সেগুলো পেরিক্লিসের জন্য লিখতেন।
সক্রিটিসের ছাত্রদের দ্বারা রচিত তিনটি দার্শনিক কথপোকথন ( প্লেটোর মেনেক্সোনাস, অ্যাসিনেস ও অ্যানটিথেনস কৃত অ্যাসপাশিয়ার খন্ডিত কথোপকথন) তৈরিতে তিনি সরব ভুমিকা পালন করেছেন। একজন গবেষক লিখেছেন, “ অ্যাসপাশিয়ার জীবন সম্পর্কে জানতে চাওয়ার অর্থ হলো মানবজাতির অর্ধেক সম্পর্কে জানতে চাওয়া।”
একজন গবেষক লিখেছেন, “ অ্যাসপাশিয়ার জীবন সম্পর্কে জানতে চাওয়ার অর্থ হলো মানবজাতির অর্ধেক সম্পর্কে জানতে চাওয়া।”
২.ক্লিয়া
ক্লিয়া(১০০ খিস্টাব্দে বর্তমান?) ছিলেন ডেলফির মন্দিরে একজন
ধর্মযাজিকা , যিনি প্রাচীন পৃথিবীতে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে
মর্যাদাপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তখনকার দিনে বিশ্বনেতারা রাজনীতি
সম্পর্কে স্বর্গীয় পরামর্শ লাভের আশায় মন্দিরের উপাসকদের শরণাপন্ন
হতেন।ক্লিয়া এই সমাজ- রাজনৈতিক পরিমন্ডলের অংশ ছিলেন।কিন্তু তিনি দর্শনের
মৌলিক তাৎপর্যে আস্থা রাখতেন।
তাঁর সমকালীন সবথেকে বিখ্যাত বুদ্ধিজীবী প্লুটাকের্র সাথে অনেকবার গভীরভাবে দার্শনিক আলোচনার সুযোগ পেয়েছিলেন। অন ব্রেভারি অব উইমেন এবং অন আইসিস এন্ড অসিরিসে প্লুটার্ক আমাদের জানাচ্ছেন, মৃত্যু, ধর্ম/নৈতিক উৎকর্ষ এবং ধর্ম ইতিহাসের উপর তাঁর ( ক্লিয়ার) গভীর বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনাগুলো প্লুটার্ককে তার নিজের কাজে অনুপ্রাণিত করেছে।
অন ব্রেভারি অব উইমেন এবং অন আইসিস এন্ড অসিরিসে প্লুটার্ক আমাদের জানাচ্ছেন, মৃত্যু, ধর্ম/নৈতিক উৎকর্ষ এবং ধর্ম ইতিহাসের উপর তাঁর ( ক্লিয়ার) গভীর বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনাগুলো প্লুটার্ককে তার নিজের কাজে অনুপ্রাণিত করেছে।
৩.থেক্লা
পল ও থেক্লা নাটকের দৃশ্যে যখন তিনি আবির্ভূত হবেন, তখনও
থেক্লা( ৩০ খ্রিস্টাব্দ?) যাপন করছেন একটি মধ্যবিত্ত গৃহের নিঃসঙ্গ জীবন।
এবং একটি সুবিধাজনক বিয়ের সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার কাছাকাছিও পৌছে
গিয়েছিলেন।কিন্তু যখন তিনি বেলকনিতে হেলান দিয়ে পলের ধর্মপ্রচারের কথাগুলো
শুনতে পেলেন,তখন সিদ্ধান্ত নিলেন জীবনের জন্য সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের একটি পথ
বেঁচে নেবেন।
তিনি পলের পুরোপুরি অনুসারী হলেন, সংযম পালন করে বিভিন্ন ধরণের কামজ আচারের উপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন এবং কর্মক্ষেত্রে মাংশাসী প্রাণীর মুখে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা পান।অবশেষে একজন শিক্ষিকা হিসেবে নিজের অধিকার নিশ্চিত করেন এবং একটি কীর্তিমান কর্মজীবনের সূচনা করেন।যদিও এরূপ বিতর্ক রয়েছে যে থেক্লা কখনোই বর্তমান ছিলেন না। অর্থাৎ তারা বলতে চান থেক্লার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, এটি হলো থেক্লা সম্পর্কে একটি কিংবদন্তি যা বহু নারীকে দার্শনিক জীবন গ্রহণে অনুপ্রাণিত করেছিল।
যদিও এরূপ বিতর্ক রয়েছে যে থেক্লা কখনোই বর্তমান ছিলেন না। অর্থাৎ তারা বলতে চান থেক্লার কোনো অস্তিত্ব ছিল না, এটি হলো থেক্লা সম্পর্কে একটি কিংবদন্তি যা বহু নারীকে দার্শনিক জীবন গ্রহণে অনুপ্রাণিত করেছিল।
প্রায় ২৫০ বছর পর, ম্যাথোডিয়াস অব অলিম্পাস থেক্লাকে প্রধান চরিত্র হিসেবে ব্যবহার করে নারীর পূণাঙ্গ দার্শনিক কথপোকথন লিখেছিলেন এবং থেক্লার দার্শনিক ও ধর্মীয় মিশনের প্রতি অনুপ্রাণিত হয়ে ম্যাকরিনার ( অল্পবয়স্ক বিখ্যাত সন্যাসিনী) ডাকনাম/ গৃহ নাম রেখেছিলেন থেক্লা।
৪.সোশিপত্র
সোশিপত্র( চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমার্থে বর্তমান) পৃথিবীতে যেন
স্বর্গবাস করে গেছেন:শিক্ষকতার সফল কর্মজীবনের পাশাপাশি তিনি একটি সুখী
পারিবারিক জীবনও লাভ করেছিলেন।বিদেশীদের কাছে অতিন্দ্রীয়বাদের পাঠ নেবার
পর, জটিল পাঠের ব্যাখা ও স্বর্গীয় জ্ঞানের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নব্য-
প্লেটোনিক সংস্কৃতিতে একজন সম্মানিত ব্যাক্তিত্বে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি
যেসব পুরুষ বিশেষজ্ঞ দ্বারা পরিবৃত হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন তাঁর
স্বামী অ্যাসটেথিয়াস।ইউনাপিয়াসের লিখিত জীবনীগ্রন্থ লাইভস অব ফিলোসফারস
বইয়ের তথ্য অনুযায়ী , সোশিপত্র যেকোনো বিশেষজ্ঞের তুৃলনায় অধিক বিখ্যাত
হয়েছিলেন এবং শিক্ষার্থীরা তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষাকে আর সবার থেকে বেশি
পছন্দ করত।
ইউনাপিয়াসের লিখিত জীবনীগ্রন্থ লাইভস অব ফিলোসফারস বইয়ের তথ্য অনুযায়ী , সোশিপত্র যেকোনো বিশেষজ্ঞের তুৃলনায় অধিক বিখ্যাত হয়েছিলেন এবং শিক্ষার্থীরা তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষাকে আর সবার থেকে বেশি পছন্দ করত।
৫.ম্যাকরিনা দি ইয়াংগার
কাপাডোসিয়ার দশটি বিস্তৃত, প্রভাবশালী শিক্ষিত
পরিবারের অন্যতম একটি পরিবারের মেয়ে ছিলেন ম্যাকরিনা( ৩৩০ -৩৭৯
খ্রিস্টাব্দ)।তীক্ষè মেধা ও ধীশক্তির বলে তিনি পরিবারকে একত্রিত রাখতে
পেরেছিলেন।ধর্মপ্রাণ আত্মা ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তির গুণে তার পূর্বপুরূষরা
বংশানুক্রমে সফল পুরুষ ও নারী সন্যাসীদের সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছিল।
তাঁর ভাই গ্রেগরি অব নিস্যা তাঁর উপর লেখা জীবনী দ্য লাইফ অব ম্যাকরিনা এবং দার্শনিক কথোপকথন অন দ্য সৌল এন্ড রিসারেকশন উভয় বইয়েই ম্যাকরিনার প্রজ্ঞার কথা স্মরণ করেছেন।পূর্বোল্লেখিত লেখাটিতে ভাই বোনের মধ্যে এমন একটি কথোপকথনের বর্ণনা আছে যেখানে দর্শন, বাইবেল এবং ভৌতবিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর ( ম্যাকরিনার) অগাধ পান্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
তাঁর ভাই গ্রেগরি অব নিস্যা তাঁর উপর লেখা জীবনী দ্য লাইফ অব ম্যাকরিনা এবং দার্শনিক কথোপকথন অন দ্য সৌল এন্ড রিসারেকশন উভয় বইয়েই ম্যাকরিনার প্রজ্ঞার কথা স্মরণ করেছেন।পূর্বোল্লেখিত লেখাটিতে ভাই বোনের মধ্যে এমন একটি কথোপকথনের বর্ণনা আছে যেখানে দর্শন, বাইবেল এবং ভৌতবিজ্ঞান সম্পর্কে তাঁর ( ম্যাকরিনার) অগাধ পান্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
৬.হাইপেশিয়া অব আলেকজান্দ্রিয়া
কতিপয় উগ্র খ্রিস্ট্রানের হাতে
অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যবরণের মর্মান্তিক ঘটনার কারণে বিশ্বে হাইপেশিয়া(৩৬০-৪১৫
খ্রিস্টাব্দ) সমধিক পরিচিত। হাইপেশিয়া, যিনি একজন নব্য-প্লেটোনিক পšিডত
ছিলেন এবং গণিত ও জ্যোর্তিবিদ্যায় তাঁর কাজের জন্য প্রশংসিত হয়েছিলেন।
তার বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে একজন,খ্রিস্টান বিশপ সাইনেসিয়াস তাঁকে বুদ্ধিদীপ্ত সব চিঠিপত্র লিখতেন, এসব চিঠিতে কেবল দর্শণই নয় বরং অজ্ঞাত গাণিতিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কথাবার্তা হত।হাইপেশিয়া তাঁর পিতা থিয়নের জ্যোর্তিবিদ্যা সংক্রান্ত ব্যাখ্যাগুলো সম্পাদনা করেছিলেন,একথা সাইনেসিয়াস তাঁর লেখায় স্বীকার করেছেন।
তার বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে একজন,খ্রিস্টান বিশপ সাইনেসিয়াস তাঁকে বুদ্ধিদীপ্ত সব চিঠিপত্র লিখতেন, এসব চিঠিতে কেবল দর্শণই নয় বরং অজ্ঞাত গাণিতিক যন্ত্রপাতি নিয়ে কথাবার্তা হত।হাইপেশিয়া তাঁর পিতা থিয়নের জ্যোর্তিবিদ্যা সংক্রান্ত ব্যাখ্যাগুলো সম্পাদনা করেছিলেন,একথা সাইনেসিয়াস তাঁর লেখায় স্বীকার করেছেন।
প্রাচীন পৃথিবীর বিশ্রুত-প্রায় নারী চিন্তকদের সম্পর্কে পর্যালোচনা নিঃসন্দেহে আমাদের ইতিহাসের দর্শনকে বিস্তৃত করে এবং আধুনিক যুগে দৃশ্যমান লিঙ্গভিত্তিক উপাদানের কথা মনে করিয়ে দেয়। দর্শনশাস্ত্রের ক্ষেত্রে একথা আরও বেশি মাত্রায় সত্য।প্রাচীন যুগের এই লৈঙ্গিক অসাম্য হাল আমলে বিশ্ববিদ্যায়গুলোতে মানবিক বিদ্যায় বেশি করে চোখে পড়ে। নারী ও পুরুষেয় লৈঙ্গিক অসাম্য ইতিহাসের নির্মাণের ক্ষেত্রে মোটেই কোনো ভালো কিছু নয়। প্রাচীন পৃথিবী যেমনভাবে নারীর মতামতকে দর্শনে অন্তভূক্ত করেছিল, তেমনি বর্তমান সময়ে দর্শন ও মানববিদ্যা চর্চায় নারীর অনÍভূক্তি আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
[গবেষক ডন লাভাল নরমান এর একটি প্রবন্ধ অবলম্বনে লিখিত |]

0 মন্তব্যসমূহ