মূলঃ মাইকেল কুগেলম্যান | অনুবাদঃ ইয়াসির আরাফাত
বিগত কয়েক মাসের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বিশ্বে মুসলিমদের একজন প্রধান রক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। “ ইসলামবিদ্বেষে উৎসাহ দিচ্ছেন“ এই অভিযোগ তুলে তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রণের সমালোচনা করেছিলেন। ফেসবুকে ইসলামবিদ্বেষী কন্টেন্টগুলো বন্ধ করার দাবি জানিয়ে ফেসবুকের প্রধান নির্বাহী মার্ক জুকারবার্গকে খোলা চিঠি দিয়েছিলেন এবং অপর একটি চিঠিতে ইমরান অমুসলিম দেশগুলিতে ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মুসলিম নেতাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।এর আগে ইসরাইলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার ব্যাপারে তার দৃঢ় অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন যতদিন পর্যন্ত ফিলিস্তিন সমস্যার কোনো ন্যায়সঙ্গত মীমাংসা হবেনা, ততদিন তিনি ইসরাইলকে স্বীকারের ব্যাপারে অনঢ় থাকবেন।যদিও চারটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও তিনি তাদের অনুসরণ করেননি।
বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়ের একজন বড় কন্ঠস্বর হিসেবে ইমরান খানের আবির্ভূত হওয়ার ঘটনা মোটেও আকস্মিক নয়। দীর্ঘ দুই দশকেরও অধিক সময় ধরে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে এবং বিশেষত ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে বার বার সরব হয়েছেন এবং বিশ্বব্যাপী জোট গঠন করে ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বান জানিয়েছেন। চেচনিয়া, ইয়েমেন, ফিলিস্তিনের অধিকৃত অঞ্চল এবং কাশ্মীরে মুসলমান সম্প্রদায়ের উপর নির্যাতনের নিন্দা জানিয়েছেন।এমনকি ইমরান খান আরও বিস্তৃতভাবে ইসলামের গুরুত্বেও প্রতি জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। তিনি পাকিস্তানীদের ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে উৎসাহিত করেন এবং ২০১৯ সালে বিশেষভাবে ইসলামের উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে ইংরেজি ভাষায় এমন একটি ইংরেনজি চ্যানেল চালু করার ব্যাপারে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ও মালয়েশিয়ার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের সাথেও জোটবদ্ধ হয়েছিলেন। পবিত্র নগরী মদিনার মডেল অনুযায়ী তিনি পাকিস্তানকে একটি ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার ব্যাপরেও আশাবাদী।স্পষ্টতই ইমরান খান মুসলমানদের ব্যাপারে নিজেকে একজন মুখপাত্র হিসেবেই দেখেন।
কিন্তু চীনে উইঘুর মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়ণ প্রসঙ্গে তার নীরবতার মাধ্যমে তিনি বিশ্বমুসলিমের রক্ষক হিসেবে উদ্দেশ্যচ্যূত হয়েছেন।
| চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ইমরান খান |
উইঘুর সম্প্রদায়ের দুর্দশা সর্বজনবিদিত। জিনজিয়াং প্রদেশে প্রায় ১০ মিলিয়ন ( ১ কোটি) উইঘুর মুসলমান রাষ্ট্রের কড়া নজরদারির মধ্যে বাস করে এবং ২০১৭ সাল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষকে বন্দী শিবিরে (ডিটেনশন ক্যাম্প) পাঠানো হয়েছে।বর্তমানে কমপক্ষে ১০ লক্ষ মানুষ সেখানে বন্দী রয়েছে। তারা এদের মধ্যে দুই শতাধিক পাকিস্তানী লোকের স্ত্রীদেরও অন্তর্ভূক্ত করেছে।( চীন এগুলোকে পুনঃশিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করেছে)। একটি হিসাব অনুযায়ী এসব সুবিধার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হলো কর্তৃপক্ষ উইঘুরদের মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলতে চায়। উইঘুরদের নিয়ে গবেষণা করা একজন শীর্ষস্থানীয় গবেষক রিয়ান থাম বলেন, তারা বন্দী শিবিরে লোকজনকে “ আমি মুসলিম নই” বলাতে বাধ্য করছে।একজন সাবেক বন্দী বলেছেন, উইঘুরদের মুসলামনদের জন্য পবিত্র দিন শুক্রবারে শূকরের মাংস খেতে বাধ্য করা হয় এবং তারা খেতে অস্বীকৃতি জানালে কঠোর শাস্তি দেওয়া হয়।
কোনো প্রকার অন্যায় আচরণের কথা অস্বীকার করেছে বেইজিং, তারা বলেছে এসব নীতি উইঘুরদের মধ্যে সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমনের জন্য । তারা প্রমাণ হিসেবে উইঘুর জঙ্গীদের দ্বারা গঠিত সন্ত্রাসবাদী দল ইস্টার্ন তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট ও তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টির দিকে আঙুল তুলছে অথচ গবেষকগণ মনে করেন এই গোষ্ঠীগুলো চীনের জন্য খুব বড় হুমকি নয়।
উইঘুর সম্প্রদায়ের ব্যাপারে ইমরান খানকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান সমস্যা সম্পর্কে সামান্যই জানেন এবং এ ব্যাপারে বেইজিংয়ের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলবেন। ২০২০ এর অক্টোবেের তার একজস উর্ধতন পরামর্শক মইদ ইউসুফ বলেন, সরকার শতভাগ সন্তুষ্ট যে এটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নয় এবং আমাদের এ ব্যাপারে উদ্বেগ নেই , এবং একেবারেই উদ্বেগ নেই। (জানুয়ারি ২০২১ এ আমার সাথে একটি উন্মুক্ত আলোাচনায় ইউসুফ পরিষ্কার করেছেন যে তেমন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নয় কেননা বেইজিংয়ের সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলোচনা করে সমাধান করা হয়েছে)
ইমরান খানের কিছু সমর্থক বলে থাকে তিনি নীরব আছেন কারণ এটি একান্তই চীনের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।কিন্তু রোহিঙ্গা নিপীড়ন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য এরকম কোনো বিষয় তার বাধার কারণ হয়ে দাঁড়ায়নি। ( অর্থাৎ চীনের অভ্যন্তরীন ব্যাপার , এজন্য তিনি নীরব ব্যাপারটা তা নয়-অনুবাদক)
ইমরান খানের নীরবতার আসল কারণ খুব সোজা: তর্কসাপেক্ষে চীন পাকিস্তানের ঘনিষ্টতম মিত্র, এবং ইসলামাবাদ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহায়তার জন্য প্রচন্ডভাবে বেইজিংয়ের উপর নির্ভর করে।সহজভাবে বললে চীনের বিরোধিতা করে গলা উঁচু করার সামর্থ্য পাকিস্তানের নেই।
যথাযথভাবে বললে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আরও কিছু দেশ উইঘুর মুসলিম নিপীড়নের প্রতিবাদ করেছে, যখন তাদের জনগণ এই নীরবতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছে। ব্যতিক্রম তুরস্ক , যাদের উইঘুরদের সাথে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বন্ধন রয়েছে এবং তারা ৫০,০০০ উইঘুর উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছে।কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত তুরষ্কের উদ্বেগ বিবেচনায় নিলে আঙ্কারা ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক যে গভীরতর হচ্ছে তা বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না।প্রতিবেদন অনুযায়ী,তুরস্ক উইঘুর রিফিউজিদের চীনে প্রত্যাবাসন করেছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সাথে বহিঃসমর্পন চুক্তির অনুমোদন, চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বলেছে যা সন্ত্রাস নিমূর্লীকরণে ব্যবহৃত হবে- আরও অনেক কিছুর প্রত্যাবর্তনকে ত্বরান্বিত করবে।
বিভিন্ন বানিজ্যিক ও বিনিয়োগ সুবিধা বিপন্ন হওয়া এড়াতে মুসলিম বিশ্ব চীনের ব্যাপারে সমালোচনা সীমাবদ্ধ করেছে।কিছু ক্ষেত্রে তারা বরং সমর্থন করেছে:২০১৯ সালে ৫০ টি মুসলিম সংখ্য্গারিষ্ঠ দেশের সমন্বয়ে গঠিত বৈশ্বিক জোট অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে যাতে মুসলিমদের প্রতি চীনের আচরণের প্রশংসা করা হয়েছে।অন্য একটি বিবৃতিতে সন্ত্রাস দমনের কার্যকরী কৌশল হিসেবে উইঘুরদেও ডিটেনশনে রাখা সম্পর্কে চীনের দাবির সাথে একমত পোষণ করেছে।অতপরঃ উইঘুরদের সমস্যার ব্যাপারে সংগঠনটি নীরব রয়েছে।
যারা ইমরান খানের নীরবতাকে জায়েজ করতে চান তারা তর্ক জুড়েছেন যে পররাষ্ট্রনীতি ব্যক্তিগত সুবিধার দ্বারা চালিত নীতি, নৈতিক বিবেচনার নীতি নয়, কোনো জাতির ক্ষোভ নির্বাচনী হতে বাধ্য।
যারা ইমরান খানের নীরবতাকে জায়েজ করতে চান তারা তর্ক জুড়েছেন যে পররাষ্ট্রনীতি ব্যক্তিগত সুবিধার দ্বারা চালিত নীতি, নৈতিক বিবেচনার নীতি নয়, কোনো জাতির ক্ষোভ নির্বাচনী হতে বাধ্য।
নিঃসন্দেহে ওয়াশিংটন উইঘুরদের অত্যাচারের ব্যাপারে, তার বন্ধুরাষ্ট্রু ইসরাইল ও ভারত কর্তৃক ফিলিস্তিন ও কাম্মীরে নিয়ার্তনের বিরুদ্ধে যতটা না করে তার থেকে বেশি নিন্দার ঝড় তুলেছে চীনের সাথে তার বিরোধকে উচ্চকিত করার জন্য ।
এবং এখন পর্যন্ত এই পরিস্থিতি ভিন্ন।ইমরান খান বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংকটে তার নিজের অবস্থান থেকে দেশে ও বিদেশে মুসলমানদের অধিকার নিয়ে যতটা সরব এমন কম বিশ্বনেতাকেই দেখা যায়। কিন্তু তিনি উইঘুরদের ব্যাপারে অস্বাভাবিকরকম নীরব, যারা কিনা গুরুতর রকমের ইসলামবিদ্বেষ এবং মুসলিম বিরোধী এমন কিছু নীতির শিকার যেগুলোর ব্যবহারকে যুক্তরাষ্ট্রের নবনিযুক্ত স্টেট সেক্রেটারি গণহত্যা বলে চিহ্নিত করেছেন।
আমরা জানি ইমরান খান এমন একজন নেতা যিনি বিশ্বের কাছে নিজেকে তুলে ধরেন মধ্যাস্থতাকারী, শান্তি প্রতিষ্ঠার সৈনিক এবং প্রান্তিক মানুষের জন্য কনন্ঠস্বর হিসেবে, তার এ নীরবতা হৃদয়বিদারক।
বৈশ্বিক ইসলামবিদ্বেষ একটি নোংরা বাস্তবতা এবং এর বিরুদ্ধে ইমরান
খানের লড়াই করার সংকল্প প্রশংসনীয়।কিন্তু যত দীর্ঘ সময় ধরে তিনি উইঘুরদের
ব্যাপারে নীরব রয়েছেন, তাতে মুসলিম বিশ্বকে রক্ষার ব্যাপারে তার অঙ্গীকার
মিথ্যায় পর্যবসিত হবে।
লেখকঃমাইকেল কুগেলম্যান ,ফরেন পলিসি উইকলির দক্ষিণ এশীয় বিশ্লেষক।তিনি এশিয়া প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর এবং উইলসন সেন্টার, ওয়াশিংটনের একজন জ্যেষ্ঠ সহযোগী।
ফরেন পলিসি উইকলি থেকে অনূদিত।
1 মন্তব্যসমূহ
সুন্দর অনুবাদ
উত্তরমুছুন