মূলঃ অ্যামেলিয়া চ্যাথাম ও রোসিও সারা ল্যাব্রাডর*||অনুবাদঃ ইয়াসির আরাফাত 

গত কয়েক বছরে ভেনেজুয়ালার অর্থনৈতিক  অবনতি ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সতর্ক বার্তা দিচ্ছে যে একটি উন্নয়নশীল দেশের খনিজ সম্পদ সে দেশটির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।


পৃথিবীর সর্বাধিক তেলের মজুদ যে দেশে, সেই ভেনেজুয়েলা একটি পেট্রোস্টেট হিসেবে সংকটের দ্বার প্রান্তে এসে পৌঁছেছে।১৯২০ এর দশকে ভেনেজুয়েলায় তেল আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে দেশটির অর্থনীতির উপর তেল যেভাবে একটি দ্রুত উন্নয়নশীল অথচ  অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক সূচকে পরিণত হয়েছে তার থেকে খনিজ সম্পদে ধনী দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়ার আছে। দশকের পর দশক ধরে চলমান দূর্বল শাসন ব্যবস্থা ল্যাটিন আমেরিকার এক সময়ের সবথেকে ধনী দেশটিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞগণের মতে, ভেনেজুয়েলা যদি এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে চায়, তবে দেশটির সরকারকে এমন একটি পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে তেল থেকে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থকে উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ করা যায়।

পেট্রোস্টেট বলতে কি বোঝায়?
পেট্রোস্টেট বলা হয় সেই রাষ্ট্রকে যার মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্কযুক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকবেঃ

  • সরকারের আয় প্রচন্ডভাবে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের রপ্তানির উপর নির্ভরশীল
  • রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা সামান্য কয়েকজন অভিজাতের হাতে কুক্ষিগত, এবং
  • রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান খুব দূর্বল এবং জবাবদিহিতার অভাব। দুর্নীতি সর্বত্র বিস্তৃত

সাধারণত আলজেরিয়া, ক্যামেরন, শাদ, ইকুয়েডর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, কাজাখস্তান, লিবিয়া, মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, ওমান, কাতার, রাশিয়া, সৌদি আরব,সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভেনেজুয়েলাকে পেট্রোস্টেট হিসেবে অভিহিত করা হয়।

পেট্রোস্টেট প্যারাডাইমের গোড়ার কথা
পেট্রোস্টেটকে অর্থনৈতিক ভাবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয় যাকে অর্থনীতিবিদরা “ ডাচ ডিজিজ“ বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। “ ডাচ ডিজিজ” পরিভাষাটি প্রথম ব্যবহৃত হতে দেখা যায় ১৯৭০ এর দশকে যখন নেদারল্যান্ড উত্তর সাগরে প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পায়।

একটি অনুন্নত দেশে খনিজ সম্পদের আকস্মিক আবিষ্কার দেশটিতে বিদেশি পুঁজির প্রবাহ ঘটায়,যা স্থানীয় মুদ্রার মুল্য বৃদ্ধি করে এবং আমদানি মূল্য অনেক কমিয়ে আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়।( আমদানি মূল্য সস্তা হওয়ায় দেশে উৎপাদন মুখী শিল্প ব্যহত হয়। কেবল সেই শিল্প গড়ে ওঠে যা রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদিশেক মুদ্রা লাভ করা যায়। ভেনেজুয়েলায় কেবল মাত্র তেল শিল্পের প্রসার হতে থাকায় অন্যান্য শিল্পের যথেষ্ঠ ক্ষতি হয়)। এই পরিস্থিতিতে অর্থনীতির অন্যান্য খাত যেমন কৃষি ও উৎপাদনমুখী শিল্পসহ অন্যান্য যে খাতগুলোকে অর্থনীতিবিদরা একটি দেশের উন্নয়ন এবং দেশটিকে প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করেন , সেই খাতগুলো থেকে শ্রমিক ও পুঁজি হ্রাস পেয়ে তা রপ্তানীমুখী শিল্পে যুক্ত হয়।এর ফলে দেশে বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেতে পারে এবং খনিজ সম্পদ রপ্তানির উপর বিপজ্জনক নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে। চূড়ান্ত পর্যায়ে পেট্রোস্টেটগুলো আঞ্চলিকভাবে তেল উৎপাদনের দিকে ধাবিত হয় এবং নিজেদের হাতে না থেকে তেলের বেশিরভাগটাই উচ্চ শুল্কে বিদেশি কোম্পানীগুলোর হাতে চলে যায়। পেট্রোস্টেটের অর্থনীতি তখন বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য ও পুঁজির লড়াইয়ের ঢেউয়ে বিপজ্জনকভাবে দুলতে থাকে।

তথাকথিত সম্পদের অভিশাপ দেশের শাসন ব্যাবস্থার উপরে গিয়ে পড়ে।যেহেতু পেট্রোস্টেটের প্রধান আয় নাগরিকদের কর থেকে নয় বরং তেল রপ্তানির অর্থ থেকে আসে, এ কারণে স্বাভাবিকভাবেই সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে সংযোগ দূর্বল হয়ে পড়ে। খনিজ সম্পদের উত্তোলন ও মূল্যবৃদ্ধির সময়গুলোতে এই সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।স্টানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং পেট্রোস্টেটের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে প্রভাবশালী বই “ দি প্যারাডক্স অব প্লেনটি” বইয়ের লেখক টেরি কার্ল মন্তব্য করেছেন,যখন তারা গণতন্ত্র, রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন আমলাতন্ত্র, বেসরকারি খাত এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেছিল, সেই সময় কিংবা প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে অধিকাংশ পেট্রোস্টেট আরও বেশি মাত্রায় পেট্রোলিয়ামের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

যে কারণে ভেনেজুয়েলাকে পেট্রোস্টেট বিবেচনা করা হয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা ব্যর্থ পেট্রোস্টেটের একটি আদি নমুনা। ভেনেজুয়েলায় তেল আবিষ্কৃত হওয়ার পর থেকে একশ বছরের অধিক সময় ধরে দেশটির উপরে তেল সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ আধিপত্য বজায় রেখে চলেছে। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য হ্রাসের কারণে ২০১৪ সালে ব্যারেল প্রতি তেলের মূল্য ১০০ ডলার হয়ে যায় যা ২০১৬ কমে দাঁড়ায় ৩০ ডলারে।এর ফলে ভেনেজেুয়েলা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। তারপর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গেছে।

ভেনেজুয়েলা ব্যর্থ পেট্রোস্টেটের একটি আদি নমুনা

কয়েকটি ভয়ানক সূচকের মাধ্যমে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা যায়ঃ


তেলের উপর নির্ভরশীলতাঃ ভেনেজুয়েলার রপ্তানী আয়ের ৯৯ শতাংশ আসে তেল বিক্রয় থেকে যা জিডিপির এক- চতুর্থাংশ।


উৎপাদন হ্রাসঃ পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে গত এক দশকে তেল উৎপাদনের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

সংকটাপন্ন অর্থনীতিঃ ২০১৮ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে জিডিপি হ্রাস পেয়েছে প্রায় দুই- তৃতীয়াংশ এবং বিশেষজ্ঞগণ পূর্বাভাস দিয়েছেন, করোনা ভাইরাস অতিমারীর কারণে তেলের চাহিদা দ্রুত কমে যাওয়ায় ২০২০ সালে জিডিপি আরও ৩০ শতাংশ হ্রাস পাবে।

ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝাঃ ভেনেজুয়েলার ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ১৫০ বিলিয়ন ডলার যা দেশটির অর্থনীতির তুলনায় দ্বিগুন আকারের।
উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিঃ বর্তমানে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ৬৫০০ শতাংশ।

বিকাশমান স্বৈরতন্ত্রঃ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গিয়ে নিকোলাস মাদুরো ও তার সহযোগিরা গণতন্ত্রের মূলনীতিগুলো লঙ্ঘন করেছেন। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি করোনা ভাইরাস অতিমারীর কারণে ভেনেজুয়েলায় ভয়ানক ধরণের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে।এছাড়া খাদ্য, সুপেয় পানি, পেট্রল এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।সাম্প্রতিক একটি জরিপ অনুযায়ী, ৯৬ শতাংশ ভেনেজুয়েলার নাগরিক দরিদ্র জীবনযাপন করছে যা ল্যাটিন আমেরিকার অন্যান্য দেশগুলোর তুলনায় সর্বোচ্চ।


২০১৫ সাল পর্যন্ত ৫০ লক্ষের অধিক মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পালিয়ে গেছে।এছাড়া করোনা ভাইরাস অতিমারীর কারণে ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কর্মরত ভেনেজুয়েলার ১ লাখ নাগরিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছে।

ছবিঃ গত কয়েক বছরে ভেনেজেুয়েলা থেকে বিভিন্ন দেশে উদ্বাস্তু ও অভিবাসী মানুষদের সংখ্যা মানচিত্র

ভেনেজুয়েলা কিভাবে এই পরিস্থিতির শিকার হলো?
বেশকিছু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় ভেনেজুয়েলা পেট্রোস্টেটের অবস্থানে এসে পৌঁছেছে।

তেলের আবিষ্কারঃ
১৯২২ সালে রয়েল ডাচ শেল কোম্পানির ভূতত্ত্ববিদগণ মারাকাইবো অঞ্চলের একটি ক্ষেত্র লা রোসায় অনুসন্ধান চালিয়ে সমৃদ্ধ তেল কূপ আবিষ্কার করে যা থেকে তৎকালীন দৈনিক ১০০ ব্যারেল হারে তেল উত্তোলন শুরু হয়।কয়েক বছরের মধ্যে হুয়ান ভিনসেন্ট গোমেজের ( ১৯০৮-১৯৩৫) সমর্থন নিয়ে প্রায় একশত কোম্পানি তেল উৎপাদন শুরু করে। ১৯২০ এর দশকে বার্ষিক তেলের উৎপাদন ১ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩৭ মিলিয়ন ব্যারেলে।১৯২৯ সালে ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রে পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তেল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে অবস্থান লাভ করে। ১৯৩৫ সালে গোমেজের মৃত্যু হলে ভেনেজুয়েলাল “ ডাচ ডিজিজ” আসন গেড়ে বসেঃ ভেনেজুয়েলান বলিভার বৃদ্ধি থাকে এবং রপ্তানির ৯০ শতাংশ দখল করে তেল শিল্প অন্যঅন্য শিল্পগুলোকে সরিয়ে দেয়।

তেল শুল্কের সংস্কারঃ
১৯৩০ এর দশকে শুধুমাত্র তিনটি কোম্পানী – রয়েল ডাচ শেল, গাফ এবং স্ট্যান্ডার্ড ওয়েল কোম্পানী ভেনেজুয়েলার তেলের ব্যবসার ৯৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করত।গোমেজের পরবর্তী শাসকরা তেল থেকে অর্জিত মুনাফা সরকারী কোষাগারে নিয়ে আসার জন্য তেল খাতের সংস্কার চাইলেন। এর লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ১৯৪৩ সালে হাইড্রোকার্বন অ্যাক্ট পাশ করা হলো। দাবি করা হলো এখন থেকে বিদেশি কোম্পানিগুলো তেল ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত মুনাফার ৫০ শতাংশ সরকারকে দেবে। ফলে পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারের আয় ছয় গুণ বৃদ্ধি পেল।

পিনটো ফিজো চুক্তিঃ
১৯৪৮ সালে সামরিক সৈ¦রশাসনের অবসান হলে ভেনেজুয়েলার নাগরিকগণ তাদের প্রথম গণতান্ত্রিক সরকারকে নির্বাচিত করে। সে বছর ভেনেজুয়েলার প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দল পুনটো ফিজো চুক্তি স্বাক্ষর করে।চুক্তিতে নিশ্চয়তা দেওয়া হয় রাষ্ট্রায়ত্ব চাকরি ও তেল থেকে অর্জিত মুনাফা ভোটের ফলাফল অনুযায়ী তিনটি দলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। চুক্তিটির মাধ্যমে স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিহত করা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত হয় যা তেল থেকে অর্জিত মুনাফা দেশে পুঞ্জীভূত হবে এমন নিশ্চয়তা প্রদান করে।

ওপেকঃ
১৯৬০ সালে ভেনেজুয়েলা- ইরান,ইরাক, কুয়েত এবং সৌদি আরবের সাথে প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে Organization of the Petroleum Exporting Countries (OPEC) ওপেকে যোগদান করে।যদিও পরবর্তী কালে সংগঠনটিতে কাতার, ইন্দোনেশিয়া, লিবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, আলজেরিয়া, নাইজেরিয়া, ইকুয়েডর, গেবন, নিরক্ষীয় গিনি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো যোগদান করে, কিন্তু কেবল সর্বাধিক তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোই তেলের মূল্য সমন্বয় এবং জাতীয় তেল কোম্পানিওে উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করত। একই বছরে, ভেনেজুয়েলা প্রথম রাষ্ট্রায়ত্ব তেল কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে এবং আয়কর ৬৫ শতাংশে উন্নীত করে।

১৯৭০ এর দশকের তেজি বাজারঃ
১৯৭৩ সালে আরব- ইসরাইল (Yom Kippur War ) যুদ্ধে ইসরাইলকে সমর্থনকারী দেশগুলোর উপর ওপেকের পাঁচ মাসের অবরোধের কারণে তেলের মূল্য চার গুণ বৃদ্ধি পায় এবং ভেনেজুয়েলা ল্যাটিন আমেরিকার সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশে পরিণত হয়। পরবর্তী দুবছরে, সরকারি কোষাগারে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার জমা হয় যা অসাধুতা ও অব্যবস্থাপনার দরজা খুলে দেয়।বিশ্লেষকদের হিসাব মতে,১৯৭২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যনÍ ১০০ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ হয়।

১৯৭২ থেকে ১৯৯৭ সাল  পর্যন্ত ভেনেজুয়েলায় ১০০ বিলিয়ন ডলার আত্মসাৎ হয়।

পিডিভিএসএঃ
১৯৭৬ সালে যখন বিশ্ব বাজারে তেলের ক্রয় বিক্রয় বৃদ্ধি পেল তখন প্রেসিডেন্ট কার্লোস আন্দ্রে পেরেজ তেল শিল্পকে জাতীয়করণ করেন, রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান পেট্রোলেজ ডি ভেনেজুয়েলা গঠন করেন, এসএ ( পিডিভিএসএ) কে পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান, উৎপাদন, শোধন এবং রপ্তানির তত্ত্বাবধানক্টষমতা প্রদান করেন। পেরেজ বিদেশি কোম্পানির সাথে পিডিভিএসএ‘র অংশীদারিত্ব অনুমোদন করেন যতক্ষণ পর্যন্ত এর অংশীদারিত্ব ৬০ শতাংশে না পৌছায় এবং এমনভারব কোম্পানিটির কাঠামো তৈরি করেন যেন ন্যূনতম রাস্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে ব্যববসা পরিচালনা করা যায়।

১৯৮০ এর দশকে তেলের সরবরাহ বৃদ্ধিঃ
১৯৮০ এর দশকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে যাওয়ায় ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে থাকে। একই সময় আমেরিকায় অবস্থিত ছিটগো তেল শোধনাগার সহ বিদেশে আরও শোধনাগর ক্রয়ের কারণে ভেনেজুয়েলা খুব বড় আকারের বিদেশি ঋণে আটকে পড়ে। এর এক মাস আগে পেরেজে পুনঃনির্বাচিত হন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মাধ্যমে অর্থনৈতিক মুক্তির অংশ হিসেবে একটি কঠোর আর্থিক নীতি ঘোষণা করেন। এই কঠোর নীতির কারণে ভয়ানক দাঙ্গা বেঁধে যায়।১৯৯২ সালে হুগো শ্যাভেজ নামের একজন সেনা কর্মকর্তা একটি ব্যর্থ অভ্যত্থানের প্রচেষ্টা করেন এবং এর মাধ্যমে জাতীয়ভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

শ্যাভেজের বলিভারিয়ান বিপ্লবঃ
ভেনেজুয়েলার বিপুল পরিমাণ তেলসম্পদকে দারিদ্র ও অসাম্য দূরীকরণে ব্যবহার করার অঙ্গীকার নিয়ে ১৯৯৮ সালে একটি সমাজতান্ত্রিক মঞ্চ থেকে হুগো শ্যাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।শ্যাভেজ যখন তার ব্যায়বহুল “ বলিভারিয়ান মিশন”এর মাধ্যামে সামাজিক কর্মসূচির বিস্তৃতি ঘটান এবং দারিদ্রের হার ২০ শতাংশ কমিয়ে আনেন, তখন দেশটিতে তেলের উৎপাদদন দীর্ঘমেয়াদে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা ১৯৯০ এর দশক এবং ২০০০ এর দশকের প্রথম দিকে সর্বাধিক কমেছিল।২০০২-২০০৩ সালে একটি তেল কারখাানায় সংঘটিত ধর্মঘটে অংশ নেওয়া হাজার হাজার অভিজ্ঞ পিডিভিএসএ কর্মীকে চাকরিচ্যুত করার ব্যাপারে শ্যভেজের সিদ্ধান্তের কারণে গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি জ্ঞান ধ্বংস হয়ে যায়। ২০০৫ সালের শুরুর দিকে পেট্রোক্যারির নামে একটি জোটের মাধ্যমে কিউবাসহ ওই অঞ্চলের দেশগুলোকে ভর্তূকিসহ তেল প্রদান করেন।শ্যাভেজের শাসনকালে, যা শেষ হয় ২০১৩ সালে, কৌশলগত তেলের মজুদ হ্রাস পায় এবং সরকারি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুনের বেশি বৃদ্ধি পায়।

শ্যাভেজ প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার ক্ষমাতাকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে শ্রমিক শ্রেণির মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি করেন এবং দেশকে স্বৈরতন্ত্রেও খাদের কিনারায় পৌছে দেনঃ তিনি শাসনের মেয়াদ বৃদ্ধি, কার্যকরভাবে সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, গণমাধ্যমকে হয়রানি, স্বতন্ত্র বিক্রয় কেন্দ্র বন্ধ করা এবং হাজার হাজার বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং এক্সন মোবিল ও কোনোকো ফিলিপস এর তেল প্রকল্পসহ বিদেশি মালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করেন। এ ধরণের সংস্কার কার্যক্রম শ্যাভেজের মৃত্যুর পর দেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মাদুরোর পথ প্রশ্বস্ত করে।

স্বৈরতন্ত্রের উত্তরাধিকারঃ
২০১৪ সালের মাঝামাঝি বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্য হ্রাস পায় এবং ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির মুক্ত পতন শুরু হয়। দেশে অশান্তি ঘনীভূত হওয়ায় মাদুরো রাজনৈতিক নিপীড়ন, নজরদারি এবং নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন। ২০১৮ সালে তিনি সর্বত্র নিন্দিত অস্বচ্ছ এবং অগণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় নিজের ক্ষমতা নিশ্চিত করেন।যুক্তরাষ্ট্রসহ ৬০ টি দেশ সংসদের প্রধান, বিরোধীদলীয় নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে ভেনেজুয়েলার অর্ন্তবর্তী নেতা হিসেবে স্বীকিৃতি দিয়েছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ওয়াশিংটন কারাকাসের উপর ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যা মাদুরো সরকারের আয় কমিয়ে দিয়েছে। ভেনেজুয়েলা এখনও তেল বানিজ্যে অংশীদারদের ধরে রাখতে পেরেছে এবং বিশ্লেষকগণ মনে করেন, চীন,কিউবা, ইরান, রাশিয়া ও তুরষ্কের সমর্থন মাদুরো সরকারকে টিকিয়ে রাখছে।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে মাদুরো ও তার সহযোগিরা বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের দাবি করে সংসদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, যা এতদিন বিরোধিদের দখলে ছিল। “ নির্বাচনে প্রতারণা হয়েছে” দাবি করে -আমেরিকা ও অন্যান্য দেশের অভিযোগকে সমর্থনপূর্বক, হুয়ান গুয়াইদো সহ অন্যান্য বিরোধী নেতারা নির্বাচন বয়কট করেছেন।কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, নিজের দখলে থাকা সংসদকে ব্যবহার করে মাদুরো তার দমনমূলক কৌশল আরও বৃদ্ধি করবে।

তেলের অভিশাপ থেকে মুক্তির কি কোনো পথ আছে?
বিশ্লেষকগণের মতে, যখন কোনো দেশ সুদৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পর প্রাকৃতিক সম্পদের উদঘাটন করে, সেই দেশের পক্ষে সম্পদের অভিশাপ ভালোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।উদাহরণস¦রুপ, কার্ল তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ১৯৬০ এর দশকে নরওয়ে উত্তর সাগরে যে তেলের সন্ধান পায়, সেটাকে কাজে লাগিয়ে নরওয়ের সুদৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দেশের উন্নয়ন ঘটাতে পেরেছে।২০১৯ সালে নরওয়ের জিডিপিতে পেট্রোলিয়ামের অবদান ১৪ শতাংশের কাছাকাািছ।সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান স্বাধীন গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের সাহায্যে সরকার ও তেল কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারলে পেট্রোস্টেটের বড় ধরণের সমস্যাগুলো হ্রাস করা সম্ভব।

সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান স্বাধীন গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের সাহায্যে সরকার ও তেল কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারলে পেট্রোস্টেটের বড় ধরণের সমস্যাগুলো হ্রাস করা সম্ভব

যদি কোনো দেশ তার অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার আগেই দেশের তেল বা অন্যান্য খনিজ সম্পদের উত্তোলন শুরু করে তাহলে সেসব দেশের জন্য সম্পদের অভিশাপকে এড়িয়ে যাওয়া খুব কঠিন। তবে বেশ কিছু প্রতিকার ব্যবস্থা রয়েছে যা উন্নয়নশীল ও  নিম্ন  আয়ের দেশগুলো ব্যবহার করতে পারে, যদি তারা সত্যি চায়। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ  জেফ্রি স্যাকস বলেন, তেল খাত থেকে অর্জিত অর্থ জনগণের ভোগ্য পণ্যের উৎপাদন খাতে কার্যকর ভাবে বিনিয়োগ করার ব্যাপারে সরকারের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যমাত্রা থাকলে এটি বেসরকারি বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করবে এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়নে সাহায্য করবে।

এটা বিস্তৃত পরিসরে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে করা আর্থিক উপায়ে করা যায় বা বাস্তবিক উপায়ে অবকাঠামো নির্মাণ শ্রমিকদের শিক্ষিত করে তোলার মাধ্যমে করা যায়।স্যাকস আরও বলেন এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অপরিহার্য।

বিপুল সম্পদের অধিকারী অনেক দেশ, যেমন: নরওয়ে এবং সৌদি আরব তাদের বিনিয়োগ নিয়ন্তণের জন্য sovereign wealth funds (SWF) গঠন করেছে। বৈশ্বিকভাবে SWF প্রায় ৯ ট্রিলিয়ন অর্থমূল্যের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে।

বিশ্লেষকগণের ধারণা, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানি যেমন, সৌর শক্তি, বায়ু শক্তি ব্যবহারের বৈশ্বিক পরিবর্তন পেট্রোস্টেটগুলোকে তাদের অর্থনীতিতে বৈচিত্র আনতে বাধ্য করবে। ভেনেজুয়েলা সহ প্রায় ২০০টি দেশ প্যারিস চুক্তিতে যোগ দিয়েছে, এটি এমন একটি চুক্তি  যা জলুবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা প্রশমনের জন্য দেশগুলোর কাছে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে।

বিগত কয়েক বছর ধরে চলে আসা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবসন্নতার কারণে ভেনেজুয়েলার পক্ষে অর্থনীতি বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়াটি খুব কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের স্থাপন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে দেশটিকে পুনরায় তার তেল খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। কিন্তু এজন্য প্রয়োজন বড় আকারের বিনিয়োগ,বিশ্লেষকদের মতে, যা ভেনেজুয়েলার অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ, তেলের চাহিদা প্রবণতা এবং জলবায়ু সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে সংস্থান করা খুব কঠিন হবে।

——————————————————————————————————————–

লেখক পরিচিতিঃ
অ্যামেলিয়া চ্যাথাম, কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস ( সিএফআর)- এর সহকারি সম্পাদক, ল্যাটিন আমেরিকা সম্পর্কে লেখালেখি করেন। সিএফআর- এ যোগ দেওয়ার আগে তিনি সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ এবং দি অরল্যান্ডো সেন্টিনেলে ইন্টার্ন হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ডিউক ইউনিভাাির্সটি থেকে কালচারাল অ্যানথ্রোপলজি- তে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্লোবাল হেলথ এবং পলিসি জার্নালিজম বিষয়েও পড়াশনা করেছেন।

রোসিও সারা ল্যাব্রাডর, লেখালেখি করেন ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে, সিএফআর- এ যোগ দেওয়ার পূর্বে তিনি কলম্বিয়ার বোগোতায় ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে ছিলেন, যেখানে তিনি সাবেক গেরিলাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তিনি ডার্মাউথ কলেজ থেকে গর্ভমেন্ট অ্যান্ড ক্লাসিকেল স্টাডিস বিষয়ে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।

কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনস এর প্রকাশনা থেকে অনূদিত।