আমার বন্ধু অালেক্সেই মাক্সিমিচ পেশকভের সাথে পরিচয় আমার বিলম্বিত কৈশোরে। তারপর অনেক সময় কেটেছে। ভুলে গিয়েছি মাক্সিমিচের কথা। এমনকি সে বইটারও কথা যার মাধ্যমে তার সাথে পরিচয়।
বইটার শুরুটা এভাবেঃ
" তাহলে আমি কাজান শহরে চলেছি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে- কম কথা নয়!
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার চিন্তাটা আমার মাথায় ঢুকিয়েছিল নিকোলাই ইয়েভরেইনভ নামে স্কুলের এক ছাত্র। ইয়েভরেইনভকে দেখলেই ভালো লাগে, সে খুবই প্রিয়দর্শন তরুণ, মেয়েদের মতো কোমল তার চোখ দুটো। আমার সঙ্গে একই বাড়ির চিলেকোঠায় থেকেছে সে। প্রায়ই আমার বগলে এক- আধখানা বই দেখে আমার সম্পর্কে ওর এত আগ্রহ জন্মায় যে আলাপ- পরিচয়ও করে নেয়। তারপর দু-দিন না যেতেই সে আমায় উঠে পড়ে বোঝাতে থাকে আমার নাকি ' অসাধারণ পাণ্ডিত্যের প্রকৃতিদত্ত' সম্ভাবনা রয়েছে।
সজোর সুললিত ভঙ্গিতে মাথার লম্বা চুলগুলো ঝাঁকুনি দিয়ে পেছনে সরিয়ে সে বলত, ' জ্ঞান বিজ্ঞানের সেবার জন্যই প্রকৃতি তোমায় সৃষ্টি করেছে।'
খরগোশ হিসেবেও কেউ যে জ্ঞান বিজ্ঞানের সেবা করতে পারে সে- বোধ তখনও আমার জন্মায়নি, এদিকে ইয়েভরেইনভ কিন্তু আমায় জলের মতো সোজা করে বুঝিয়ে দিল যে বিশ্ববিদ্যালয়ে নাকি ঠিক আমার মতো ছেলেদেরই অভাব রয়েছে। পন্ডিত মিখাইল লমনোসভের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তটাও সঙ্গে সঙ্গে তুলে ধরল সে। ইয়েভরেইনভ বলল, কাজানে তার সঙ্গে থেকে আমি শরৎ আর শীতের সময়টায় স্কুলের পাঠ একেবারে সড়গড় করে ফেলব, তারপর আমার 'দু- চারটে' পরীক্ষা দিতে হবে - 'দু-চারটে', কথাটা সে ওইভাবেই বলেছিল; বিশ্ববিদ্যালয় আমায় বৃত্তি দেবে; এবং বছর পাঁচেকের মধ্যেই আমি একজন ' বিদ্বান ব্যক্তি ' হয়ে যাব।ব্যস্, জলবৎ তরলং.... "
অতঃপর মাক্সিমিচ দিদিমাকে কাঁদিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলল বিশ্ববিদ্যালয় পড়বে বলে। বিংশ শতাব্দীর জার শাসিত রুশ সাম্রাজ্যে অাশ্রিত থেকে, রুটির দোকানে কারিগরের সাগরেদি করে অনেক বইপত্র পড়তে পারলেও শেষ পর্যন্ত কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পেরেছিল কি না জানা যায় না। এই যে আশ্রিত জীবন, কুকুরের মতো জীবন, রুটির দোকানের সাগরেদির জীবন কিংবা গোপন বিপ্লবী সংঘের কার্যক্রম ও পাঠচক্রগুলোকে অ্যালেক্সেই মাক্সিমিচ বলেছেন My Universities. উপন্যাসের ( আমি উপন্যাস বলতে নারাজ অবশ্য) শেষটায় তাকে দেশান্তরি হতে দেখা যায় খালাসিদের সাথে....। বহুদিন কেটে গেছে। আমি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেছি পড়তে এমন অমিত সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু সেখানে অতিবাহিত ৫ বছরে আমার ঝুলিতে ধুলোকণাও জমেনি। মাক্সিমিচের পাঠশালাগুলো তাকে যেভাবে শিখিয়েছে জীবনের গভীর পাঠ, তার তুলনা নেই।...... বইটি নিয়ে বিস্তর লেখার যোগ্যতা আমার এখনও হয়নি বলে আমার বিশ্বাস।
দীর্ঘ ৬/৭ বছর পর বইটি দেখে মনো হলো কৈশোরের বন্ধুর সাথে পুনর্মিলন হলো। নতুন করে পড়তে শুরু করে দিয়েছিলাম দুদিন আগে।গতকাল ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বৃষ্টি, সারাদিন বিদ্যুৎ নেই, ফোন বন্ধ হয়ে গিয়ে অঢেল সময় হাতে ছিল।বইটি আদ্যোপান্ত পড়া হলো। একশ বিশ পৃষ্ঠার ছোট্ট বইটি পড়তে হাঁপিয়ে উঠেছি- এই হচ্ছে বর্তমান পাঠের অবস্থা!! ম্যাক্সিম গোর্কির এই বইটির ইংরেজিতে নাম My Universities.রুশ ভাষায় কখনো পড়া হবেনা হয়ত।তবে ইংরেজি ভাষায় পড়ার ইচ্ছে আছে। আমার কাছে থাকা বাংলা বইটির নাম " পৃথিবীর পাঠশালায়"। রথীন্দ্র সরকার অনূদিত।
মায়েস্ত্রো ম্যাক্সিম গোর্কির সব লেখা আমার পড়া হয়নি।এখনো সেসবের জন্য উদগ্র কামনা বোধ করি....
0 মন্তব্যসমূহ